Read it in English | গবেষক এবং প্রতিবেদক: তানজিল ফুয়াদ ইসফাকুল কবির |
নেটফ্লিক্স বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের যাত্রার শুরুর গল্পটা এতো সহজ ছিলো না । ১৯৯৭ সালে যখন নেটফ্লিক্স যাত্রা শুরু করে তখন গ্রাহকদের কাছে ডাকযোগের মাধ্যমে ভিডিও পাঠাতো। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিবর্তনের মাধ্যমে আজ নেটফ্লিক্স বিশ্বের ১৯০টিও বেশি দেশে তারা সেবা দিয়ে আসছে। এবং মজার ব্যপার হচ্ছে এই স্ট্রিমিং বর্তমানে বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের ১৫ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার করছে।
নেটফ্লিক্সের জন্ম কিভাবে?
১৯৯৭ সালে নেটফ্লিক্সের জন্ম হয়েছিল রিড হ্যাস্টিংস ও মার্ক র্যান্ডলফ- এর হাত ধরে। তাদের প্রথম অফিস ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্কটস ভ্যালিতে। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, রিড হ্যাস্টিংস একবার “অ্যাপোলো ১৩” সিনেমা ভাড়া নিয়েছিলেন এবং ছয় সপ্তাহ পরে সে তা ফেরত দিতে গিয়ে পরেন বিপত্তিতে, কারণে তাকে জরিমানা দিয়ে হয়ে ছিল ৪০ ডলার। এই ব্যপারটিই তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি চিন্তা করতে থাকেন যে যদি এমন কোন সিস্টেম থাকতো যেখানে গ্রাহকরা অনলাইনে তাদের পছন্দের সিনেমা অর্ডার করতে পারতেন এবং ডাকযোগে সিনেমা তাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
তবে অনেকে বলেন এই গল্পটি শুধু মাত্র একটি, মার্কেটিং কৌশল। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে, রিড এবং মার্ক একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করতেন। কোম্পানির থেকে চাকরি হারানোর ভয়তে তারা, নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা করে। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছিল একটি ভিন্ন ধর্মী বিভিন্ন ই-কমার্স আইডিয়া, যার মধ্যে মার্ক রাখতে চেয়েছিল সার্ফবোর্ড, বেসবল ব্যাট, কুকুরের খাবার সহ আরও অনেক কিছু। কিন্তু রিডের ধারণা ছিল এই আইডিয়া কাজ করবে না।
তার কিছুদিন পরেই তারা জানতে পারলেন যে জাপানে একটি নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে। যার নাম DVD (ডিভিডি)। এরি সাথে সাথে তাদের মাথায় আইডিয়া আসলো যে কেন না তারা পরীক্ষামূলক ভাবে সিডি কেনা বেচার ব্যাবসা করলে কেমন হয়। যেই বলা সেই কাজ প্রথমে গ্রাহকদের কাছে ডাকযোগে পাঠান বিভিন্ন মুভির সিডি এবং এটি সঠিকভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর পর তারা নিশ্চিত হলেন যে তাদের এই পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে।
১৯৯৭ সালের ২৯ আগস্ট নেটফ্লিক্স আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়। তবে দুইজনের পরিশ্রমের এই নেটফিক্স এর ৭০% মালিকানা নিয়ে চেয়ারম্যান হন রিড হ্যাস্টিংস। আর মার্ক র্যান্ডলফকে বানানো হয় নেটফ্লিক্সের প্রথম সিইও।
নেটফ্লিক্স প্রতিষ্ঠা হবার পরে কি হলো?
শুরুর দিকে নেটফ্লিক্স বিভিন্ন ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক একটি মডেল গ্রহণ করে, যেখানে গ্রাহকরা নির্দিষ্ট মাসিক ফি দিয়ে যত খুশি তত ডিভিডি ভাড়া নিতে পারবেন। ১৯৯৯ সালের শেষ দিয়ে আমেরিকার মানুষ নেটফ্লিক্স পছন্দ করতে শুরু করে এবং ২০০০ সালের এটি একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবসা হয়ে ওঠে।
নেটফ্লিক্সের আদি থেকে বর্তমান
১৯৯৭: নেটফ্লিক্স প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯৮: ওয়েবসাইট চালু হয় এবং প্রথম দিনে ১৩৭টি অর্ডার লাভ।
১৯৯৯: গ্রাহক সংখ্যা ২,৩৯,০০০-এ পৌঁছে এবং ভিডিও লাইব্রেরিতে ৩,১০০টির বেশি ভিডিও যুক্ত হয়।
২০০১: সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।
২০০২: নেটফ্লিক্স প্রথম শেয়ার বাজারে প্রবেশ করে এবং ৮২.১ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়।
২০০৭: নেটফ্লিক্স তাদের স্ট্রিমিং পরিষেবা চালু করে, যা ধীরে ধীরে তাদের মূল ব্যবসায় পরিণত হয়।
২০১০: নেটফ্লিক্স ঘোষণা করে যে তারা স্ট্রিমিংকেই তাদের প্রধান ব্যবসা হিসেবে চালিয়ে যাবে।
২০১৩: নেটফ্লিক্স নিজস্ব কনটেন্ট তৈরি শুরু করে, যার প্রথম সিরিজ ছিল “হাউস অফ কার্ডস”।
২০১৬: একসাথে নেটফ্লিক্স ১৩০টি দেশে স্ট্রিমিং পরিষেবা চালু করে।
২০১৭: বিশ্বব্যাপী গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছে যায়।
২০২১: নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২০৯ মিলিয়নে পৌঁছে।
২০২২: প্রথমবারের মতো গ্রাহক সংখ্যা কমতে থাকে, ফলে নেটফ্লিক্স নতুন পদক্ষেপ নেয়, যেমন পাসওয়ার্ড শেয়ারিং বন্ধ করা ও বিজ্ঞাপনসহ সস্তা সাবস্ক্রিপশন চালু করা।
নেটফ্লিক্সের আধিপত্য শেষ হবে কবে?
বর্তমানে শুধুমাত্র নেটফ্লিক্স নয় বাজারে আরও অনেক স্ট্রিমিং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ডিজনি+, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, এইচবিও ম্যাক্স, হুলু, অ্যাপল টিভি+ এবং প্যারামাউন্ট+ এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নেটফ্লিক্সের বড় প্রতিযোগী। প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকদের আকর্ষণ করার জন্য নিজেদের কনটেন্ট তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলে মনে করছেন অনেকে। কিছু দেশীয় স্ট্রিমিং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে বেশ ভালো করছে। যেমন, বঙ্গ, চরকি ইত্যাদি। তাই নেটফ্লিক্সের আধিপত্য ধরে থাকতে হলে তাদের সবার থেকে এগিয়ে থাকতে হবে সব দিক থেকে। যদিও এই কাজটা বেশ ভালো ভাবেই করছে তারা। রিজিওন ভিত্তিক বিভিন্ন ভালো ভালো সিরিজ মানুষকে উপহার দিয়ে। যেমন, ভারতের দর্শকদের আকর্ষণ করতে Netflix Sacred Games, Delhi Crime এবং Kota Factory-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ তৈরি করেছে তারা। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার দর্শকদের জন্য Kingdom, Squid Game এর মত সেরা কিছু সিরিজ উপহার দিয়েছে তারা যা বিশ্বব্যপী বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়া জার্মান দর্শকদের জন্য Dark, Barbarians, এবং How to Sell Drugs Online (Fast) দারুণ জনপ্রিয় হয়। স্পেনের দর্শকদের জন্য Money Heist, Elite, এবং Sky Rojo ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় পুরো মুভি জগতে।
নেটফ্লিক্সের ভবিষ্যৎ কি?
বর্তমানে নেটফ্লিক্সকে ডিজনি+, হুলু, প্রাইম ভিডিও, এবং এইচবিও ম্যাক্স-এর মতো শক্তিশালী প্রতিযোগীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আরও আকর্ষণীয় কন্টেন্ট তৈরি করাই হবে নেটফ্লিক্সের ভবিষ্যৎ কৌশল। তাই এই বিষয়ে এক নাইজেরিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক কুনলে আফোলায়ান বলেছেন, “আপনাকে এখন আর হলিউড যেতে হবে না, কারণ নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা সম্ভব।” নেটফ্লিক্সের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা কীভাবে নতুন কৌশল গ্রহণ করে এবং দর্শকদের কীভাবে আরও আকৃষ্ট করতে পারে তার উপর।
Comments