Read it in English | গবেষক এবং প্রতিবেদক: শামা সুলতানা আয়েশা আক্তার |
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ার আগে রেডিও বেশ জনপ্রিয় ছিলো। আমাদের সকলেরই রেডিও নিয়ে নানা স্মৃতি রয়েছে। রাতের বেলা রেডিওতে গান শোনা কিংবা সংবাদ শোনার জন্য পরিবারের সকলে মিলে রেডিওতে কান পেতে থাকা অথবা সারাদিন ক্রিকেট ম্যাচের ধারাভাষ্য শোনা সহ অসংখ্য স্মৃতি এখনো আমাদের চোখে ভাসে। মনে হয়, এইতো কয়দিন আগেও আমরা রেডিও শুনতে শুনতে অংক করতাম, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে কিছুদিন আগেও রেডিও বাজতো। তবে এখন সময় বদলেছে। আমরা আর আগের মতো রেডিও নির্ভরশীল নই।
তবে আমাদের এক রেডিও নির্ভর ইতিহাস রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এরশাদ শাসনামলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সবকিছুতেই রেডিও জড়িত ছিলো ওতপ্রোতভাবে। বিশেষ করে বিবিসি বাংলা রেডিও সম্প্রচার যেনো ছিলো দেশের মানুষের আস্থা- ভরসার অন্য নাম। বিবিসি বাংলার ৮১ বছরের সুদীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি ঘটেছে ২০২৩ সালে। চলুন আজকে আমরা জেনে নেই সোনালি স্মৃতিতে মোড়ানো বিবিসি বাংলা রেডিও কেনো সম্প্রচার বন্ধ ঘোষণা করে।
বিবিসি বাংলা ইতিহাস
বিবিসি বাংলা রেডিওর ইতিহাস বেশ পুরোনো। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৯৪১ সালের ১১ই অক্টোবর বাংলায় ১৫ মিনিটের সাপ্তাহিক সম্প্রচার শুরুর মাধ্যমে যাত্রা হয়েছিলো বিবিসি বাংলার রেডিও কার্যক্রমের। আর সংবাদ সম্প্রচার শুরু হয়েছিলো ১৯৬৫ সালে। বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইট চালু হয় ২০০৫ সালে। বিবিসি বাংলা বাংলাদেশ বেতারের সাথে ১৯৯৪ এবং ২০০৮ সালের চুক্তির মাধ্যমে যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর এবং কুমিল্লায় এফ এম ব্যান্ডে দৈনিক ১২ ঘণ্টা বাংলা এবং ইংরেজি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতো।
বিবিসি বাংলা বন্ধ হওয়ার কারণ
বিশ্বব্যাপী অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম হলো বিবিসি বা ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন। আর বিবিসি বাংলা হলো বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অধীনে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষায় সম্প্রচারিত বিবিসির একটি বিভাগ। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বিবিসি বাংলাসহ দশটি ভাষার রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। তবে কোন ভাষা বিভাগই পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি বরং অনলাইন কার্যক্রমে পরিচালিত হচ্ছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিবিসি কেন্দ্র থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এই সিদ্ধান্তের কারণে মোট ৩৮২টি পদ শূন্য হবে। ফলে ২৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৩২০ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় হবে। বার্ষিক মোট ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড সঞ্চয়ের অংশ হিসেবে সিবিবিসি ও বিবিসি ফোরকেও অনলাইনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মূলত বিবিসি নিজেদের খরচ কমানোর জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছে।
ডিজিটাল এই যুগে মানুষ ইন্টারনেটের উপর বেশ নির্ভরশীল। আগের মতো এখন আর কেউ রেডিও শুনে না। এজন্যও বিবিসি ১০ টি ভাষার রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে তা অনলাইনে শিফট করেছেন। এতে তাদের সঞ্চয়ের পাশাপাশি দর্শক সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। ২০০৭ সালে করা এক শ্রোতা জরিপে বিবিসি দেখতে পায়, তাদের শ্রোতাসংখ্যা শুধু বাংলাদেশেই সপ্তাহে প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে বিবিসির করা আরেকটি শ্রোতা জরিপে দেখা যায়, রেডিওর শ্রোতা কমে সাপ্তাহিক ২৬ লাখে নেমে এসেছিলো। ২০১৮ সালেই বিবিসি বাংলার টেলিভিশন অনুষ্ঠান নিয়ে একটা জরিপ করে। সেই জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, সেসময় বিবিসি বাংলার টেলিভিশন দর্শক ছিল ৮৫ লাখ। অর্থাৎ, মানুষ রেডিও বিমুখ হয়ে গেছে।
২০০৬-০৭ সালের দিকে রেডিও শ্রোতার সংখ্যা বেশি হওয়ার মূল কারণ ছিলো রাজনৈতিক। সেসময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট চলছিলো। বরাবরের মতোই সংকটকালীন সময়ে দেশের মানুষ নিরপেক্ষ সংবাদের জন্য বিবিসির উপর ভরসা করেছিলো। সেই সময় বিবিসি এমন সব বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে, যা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পারেনি। এজন্যই ২০০৭ সালের জরিপে বিবিসির এত শ্রোতা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
শেষ কথা
প্রবাদে আছে, ‘যার শুরু আছে তার শেষ অবশ্যই আছে’। চিরায়ত এই বাক্যকে সত্য প্রমাণ করে, ২০২২ সালে ৩১ ডিসেম্বর রাতে বিবিসি বাংলা রেডিওর অনুষ্ঠান ‘পরিক্রমা’ তে শেষবারের মতো শোনা গেছে, ‘আপনারা শুনছেন বিবিসি বাংলা’। আর এরই মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ ৮১ বছরের ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। দর্শকদের চাহিদা মেটাতে, ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মেলাতে বিবিসি বাংলা এখন সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে শিফট হয়েছে।
Comments